বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী এক জাপানি

বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী এক জাপানি

প্রবীর বিকাশ সরকার | আপডেট: ২০:৩৪, নভেম্বর ১৩, ২০১৪

নিওয়া কিয়োকোপৃথিবীতে অঞ্চলভেদে মানবজাতির ভাষা বিবিধ। এই ভাষার কারণে গোত্রে-গোত্রে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে সংস্কৃতির মিল-অমিল বিদ্যমান। কোন ভাষা সহজ, কোন ভাষা কঠিন, তা নির্ভর করে মানুষের আগ্রহ, মেধা ও পরিকর্ষতার ওপর। ভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করার পরও কথন, লেখন ও অনুবাদের ক্ষেত্রে নানা অসংগতি থাকেই। যতই ভাষাগত, উচ্চারণগত, ব্যাকরণগত মিল বা আত্মীয়তা থাকুক না কেন, স্বীকার করতে হবে যে প্রতিটি ভাষাই স্বতন্ত্র। ভাষাগত কারণে সংস্কৃতি ও সাহিত্য স্বতন্ত্র, দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন এবং চিন্তা বৈচিত্র্যময়। বস্তুত এই বৈচিত্র্যই বিদেশি বা বিপরীত ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে আকৃষ্ট করে এসেছে যুগে যুগে।
আধুনিককালে জাপানি ও বাংলা ভাষাভাষী এই দুই জাতির ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছে। বিগত শতবর্ষ ধরে জাপানি ও বাঙালির মধ্যে ব্যাপক আদান–প্রদান ঘটেছে বললে বেশি বলা হয় না। কারণ সে পরিমাণ ইতিহাস ও দলিলপত্রই এর অকাট্য প্রমাণ। যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯০২ সালে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় জাপানি প​ণ্ডিত ও শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন (১৮৬৩-১৯১৩) এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ঐতিহাসিক সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ দূতাবাসে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে এক আলোচনা সভায় নিওয়া কিয়োকাঐতিহাসিক বলা এই কারণে যে, এই সম্পর্ক পরবর্তীতে জাপান ও ভারত তথা বাংলাদেশের মধ্যে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিকে ধাবিত হয়েছে। সম্ভবত এশিয়া মহাদেশে একমাত্র কোরিয়া ও চীনকে বাদ দিয়ে আর কোনো দেশ বা জাতির মধ্যে এত গভীর দ্বিপক্ষীয় আধ্যাত্মিক সম্পর্কের কথা জানা যায় না। ওকাকুরা-রবীন্দ্র সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যে বিশাল ইতিহাস ছড়িয়ে ছটিয়ে আছে বিচ্ছিন্নভাবে, আজও তা লিপিবদ্ধ হয়নি সঠিকভাবে। যদি হতো, তাহলে জাপানি ও বাঙালি জাতির মধ্যে কর্ম, চিন্তা ও যৌথ উন্নয়নমূলক উদ্যোগের চূড়ান্ত রূপ নিত অনেক আগেই। মূলত অর্থনৈতিক বিভাজনের কারণে এই শতবর্ষ সম্পর্কটি অজানাই থেকে গেছে এবং বৃহৎ কোনো কাজেই লাগেনি। পাশাপাশি মানসিক বা আধ্যাত্মিক চিন্তা ধারণ করে থাকে মননশীল সাহিত্য। তার পাঠ ও অনুবাদ দুই দেশেই সমান্তরালভাবে এগিয়ে যায়নি। বাংলা সাহিত্য বিশেষ করে রবীন্দ্র সাহিত্য জাপানে যেভাবে পঠিত, অনূদিত ও গবেষণা করা হয়েছে, তা এক কথায় বিস্ময়কর। সে তুলনায় অন্যান্য বড়মাপের সাহিত্যিকদের রচনা নিয়ে যা কাজ হয়েছে বা হচ্ছে, তা নিতান্তই হাতেগোনা। যেমনটি জাপানি সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাংলাভাষায় হয়েছে।
রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে যেসব বাঙালি কবি-সাহিত্যিকের রচনা জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে আজ পর্যন্ত সেটা এক বিশাল প্রাপ্তি বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য। এই দুরূহ কাজগুলোর মূল্যায়ন যথার্থভাবে আজও হয়নি। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের এমন সমাদর একমাত্র জাপান ছাড়া আর কোনো দেশে হয়েছে বা হচ্ছে, নজরে পড়ে না। তথাপি যে দেশে বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করার অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়নি আদৌ, সে দেশে যাঁরা বাংলাভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন, তা মোটেই পেশাগত নয়, নিতান্তই প্রবল অনুরাগ বা প্যাশন থেকে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অধ্যাপিকা নিওয়া কিয়োকো (১৯৫৭-)।
অধ্যাপক উসুদা মাসাইউকি ও নিওয়া কিয়োকোর সঙ্গে লেখকদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার জাপানে রবীন্দ্রচর্চার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৬১ সালে জাপানে ঘটা করে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হয়। নতুন আলোয় রবীন্দ্রনাথ জাপানে উদ্ভাসিত হন। রবীন্দ্র–আকর্ষণে বেশ কিছু তরুণ-তরুণী বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্বনামধন্য বাংলা ভাষার শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক ড.ৎসুয়োশি নারা, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি কল্যাণ দাশগুপ্ত, বাংলাদেশের সাংবাদিক ইসকান্দার আহমেদ চৌধুরী প্রমুখের প্রচেষ্টায় বাংলাভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই সময় ‘বাংলা সাহিত্য পাঠ সংস্থা’ নামের একটি চক্রের কথা জানা যায়। এতে বাংলাদেশ বিষয়ে স্বনামধন্য গবেষক, বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী ও বিশিষ্ট রবীন্দ্রভক্ত অধ্যাপক উসুদা মাসাইউকি সদস্য ছিলেন। তাঁর ভাষ্য থেকে জানা যায়, সত্তর দশকের শেষদিকে নিওয়া কিয়োকো এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত হন। তিনি মূলত টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিন্দি ভাষায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহী হন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘(আমি) সাহিত্যের ছাত্রকালীন অবস্থায় রবীন্দ্রসাহিত্যের সঙ্গে আমার পরিচয়। আপনি হয়তো জানেন যে জাপানে রবীন্দ্রসাহিত্য বেশ জনপ্রিয়। তা রবীন্দ্র সাহিত্য পড়তে যেয়েই আমি বাংলা সাহিত্যকে আরও বেশি করে কাছ থেকে জানার সুযোগ পাই। যেহেতু বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ সে রকম খুব একটা হয়নি, তাই ভাবলাম বাংলাটা যদি নিজে শিখে নিতে পারি তাহলে এ ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে আরও বেশি পরিচিত হতে পারব। এভাবেই বাংলার প্রতি আগ্রহটা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। পরবর্তী সময় ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ওপর পিএইচডি করি (১৯৮৮) এবং বাংলা সাহিত্যকে জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে জাপানিদের কাছে পরিচিত করার চেষ্টা করছি।’
নিওয়া কিয়োকো অনূদিত বাংলাদেশের নির্বাচিত কবিতাঅধ্যাপিকা নিওয়া কিয়োকো আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্যমানের দিক থেকে বাংলা সাহিত্য নিঃসন্দেহে আধুনিক ও উন্নত। তারাশঙ্কর, বিভূতি, মানিক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, নজরুল—এঁদের উপন্যাস পড়ে আমার এই মনে হয়েছে যে উপন্যাসগুলোর ইংরেজি অনুবাদ হওয়া খুবই জরুরি। শুধু অনুবাদ হয়নি বলেই একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এইসব সময়োত্তীর্ণ বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের তেমন কোনো আত্মিক যোগাযোগ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের মান বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় রচিত বিখ্যাত সাহিত্যের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।’
টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়, তোওকাই বিশ্ববিদ্যালয় ও আজিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পর ২০১২ সাল থেকে টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত নিওয়া কিয়োকো কলকাতা ও ঢাকার শিক্ষা ও সাহিত্যাঙ্গনে বেশ পরিচিত নাম। একাধিকবার তিনি এই দুই শহরে যাতায়াত করেছেন। খুব কাছে থেকে তিনি বাঙালিকে দেখেছেন বলে তাঁর মধ্যে বাংলার ইতিহাস, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা জন্মলাভ করেছে। আসলে একটি দেশের বা জাতির সাহিত্যকে গভীরভাবে বুঝতে হলে সে দেশের ইতিহাস ও মানুষকে না জানলে নয়। সেই বিবেচনায় তাঁর কর্মসাধনা সার্থক বলে অভিমত ব্যক্ত করা যায়। তাঁর প্রচেষ্টার কারণেই আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জাপানে বিস্তৃতি লাভ করছে। জাপানি পাঠকদের কাছ থেকে অনেক সাড়া পেয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, সত্যি কথা বলতে জাপান ও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেহারায় কিন্তু খুব একটা অমিল নেই। দুটো দেশই ধর্মীয় মূল্যবোধের বেড়ায় বন্দী। দুটো দেশের মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং মনন প্রায় একই রকম। সেদিক থেকে জাপানিদের বাংলা সাহিত্যের বিষয় এবং ভাবনায় নিজেদের আত্মস্থ করে নিতে খুব একটা হোঁচট খেতে হয়নি।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখিত অধ্যাপিকা নিওয়া কিয়োকোর নতুন গ্রন্থএই পর্যন্ত তাঁর পরিশ্রমসাধ্য প্রতিটি কাজই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। ১৯৭৬ সালে বাংলা সাহিত্য পাঠ সংস্থা থেকে একটি সাহিত্যপত্রিকা কল্যাণী প্রকাশিত হয় জাপানি ভাষায়। এতে সেই সময়কার বাংলা ভাষার শিক্ষার্থীরা লিখতেন। মনে হয় কাগজটি বার্ষিক ছিল। এর ১৬টি সংখ্যার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। কাগজটির সম্পাদক অধ্যাপক উসুদা মাসাইউকির সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল এখনো অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই কল্যাণীতে নিয়মিত লিখতেন নিওয়া কিয়োকো। কল্যাণীর ১৩ নম্বর সংখ্যায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ১৪ নম্বরে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ১৫ নম্বরে জয় গোস্বামীর কবিতার অনুবাদ ও ১৬ নম্বর সংখ্যায় বীরভূম এবং তারাশঙ্করের কবি উপন্যাস নিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা কবিতা মনে হয় তাঁকে প্রথম থেকেই প্রভাবিত করেছিল হয়তো রবীন্দ্রনাথের কল্যাণেই। তারপর ঝুঁকেছেন আধুনিক কবিতার দিকে। বীরভূমে জন্ম সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারণ কবিও তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। রবীন্দ্রনাথের পর কি তিনি তারাশঙ্কর দ্বারা আন্দোলিত হয়েছিলেন? তারই প্রমাণ যেন তারাশঙ্করের বিখ্যাত উপন্যাস জলসাঘর যা ১৯৯৩ সালে তিনি অনুবাদ করেন। নিঃসন্দেহে একটি দুরূহ কাজ।
বাংলাদেশ মানেই চিরবিদ্রোহের দেশ। বাদ–প্রতিবাদ, বিদ্রোহ বাঙালি কবিদের অস্থিমজ্জার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবিকুলের শ্রেষ্ঠ কবি। নজরুলের কবিতা বিদেশিদেরকে নাড়া দিলেও তাঁকে নিয়ে গবেষণা বা তাঁর গ্রন্থাদির অনুবাদ হয়নি বললেই চলে। সেই দৃষ্টিতে দেখলে জাপানি সমাজে নিওয়া কিয়োকোই মনে হয় প্রথম নজরুলকে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন জাপানে নজরুল কবিতা সংকলন গ্রন্থে। নজরুলের কবিতার জাপানি অনুবাদগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। ২০০৩ সালে তিনি অধ্যাপক উসুদা মাসাইউকির সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদ করেন বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদী উপন্যাসটি। ২০০৪ সালে অনুবাদ করেন বাংলা সাহিত্যের আরেক কালজয়ী উপন্যাস সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লাল সালু। এছাড়া বাংলাভাষা শেখার জন্য দুটি অনুশীলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে—একটি অধ্যাপক মাচিদা কাজুহিকোর সঙ্গে যৌথভাবে সিডি এক্সপ্রেস বেনগারু গো (২০০৪) এবং এককভাবে রচিত নিউ এক্সপ্রেস বেনগারু গো (২০১১) নামে।
এই গ্রন্থগুলোর পাশাপাশি তাঁর শ্রমসাধ্য অসামান্য কাজ হচ্ছে ২০০৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ তথা বাংলা সাহিত্যের চারজন প্রধান কবির জাপানি অনুবাদের সংকলন বাংগুরাদেশু শি ছেনশুউ বা বাংলাদেশের নির্বাচিত কবিতা নামে। সোয়া ৩০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটিতে যে চারজন কবির কবিতা রয়েছে তাঁরা হলেন নির্মলেন্দু গুণ, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী ও শামসুর রাহমান। নির্মলেন্দু গুণের ২৭টি, আল মাহমুদের ২৫টি, শহীদ কাদরীর ২৭টি ও শামসুর রাহমানের ২৯টি ছোট-বড় কবিতা তিনি নির্বাচিত করেছেন।
কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতাগুলো যথাক্রমে হুলিয়া, ভালোবাসার টাকা, মানুষ, পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু, প্রথম পৃথিবী, যেহেতু যাইনি যুদ্ধে, আমার সংসার, যদি পেছন দিকে তাকাও, তোমার না-থাকাগুলো, কবির বাগান, যাত্রাভঙ্গ, কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে আলাপ, স্বপ্ন-নবভৌগোলিক শিক্ষা, জীবনের প্রথম বরফ, আমি বিষ খাচ্ছি অনন্ত, আরও এক ঋতু আছে, ছিন্নপত্র ১৯৭৬, নিরঞ্জনের পৃথিবী, কবর ও কারাগার, হঠাৎ দেখা, এখনো কি সমুদ্র সেই আগের মতো আছে, কাশবন ও আমার মা, আকাশ সিরিজ ১-২-৩, বন্যা এবং যখন আমি বুকের পাঁজর খুলে দাঁড়াই।
জাপানিদের জন্য বাংলাভাষা শেখার পাঠগ্রন্থ এক্সপ্রেস বেনগারু গোকবি আল মাহমুদের কবিতাগুলো যথাক্রমে অরণ্যের ক্লান্তির দিন, বৃষ্টির অভাবে, এমন তৃপ্তি, ফেরার সঙ্গী, অবুঝের সমীকরণ, নৌকায়, জল দেখে ভয় লাগে, আমার সমস্ত গন্তব্য, সবুজ পাতার, প্রত্যাবর্তনের লজ্জা, অন্তর্ভেদী অবলোকন, সোনালি কাবিন ১, চোখ, আমার অনুপস্থিতি, বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার, ফররুখের কবলে কালো শেয়াল, চান্দের দিকে, কিছু মনে নেই, শ্রাবণ, সত্যরক্ষার তাগাদা, অনন্তকাল, প্রেয়সী তোমাকে, লেখার সময়, ডানাওলা মানুষ এবং আমি শুধু।
কবি শহীদ কাদরীর কবিতা যথাক্রমে, বৃষ্টি-বৃষ্টি, মুত্যুর পরে, স্মৃতি: কৈশোরিক, জানালা থেকে, প্রিয়তোমাষু, অলীক, নগ্ন, ইন্দ্রজাল, বাংলা কবিতার ধারা, নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে, পাখিরা সিগন্যাল দেয়, ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়, বন্ধুদের চোখ, এইসব অক্ষর, গোধূলি, টাকাগুলো কবে পাবো?, জতুগৃহ, তোমাকে অভিবাদন-প্রিয়তমা, আজ সারাদিন, কেন যেতে চাই, শীতের বাতাস, উত্থান, আর কিছু নেই, এও সঙ্গীত, একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল, একটি উত্থান-পতনের গল্প এবং দাঁড়াও আমি আসছি।
কবি শামসুর রাহমানের কবিতা যথাক্রমে দুঃখ, যে আমার সহচর, কখনো আমার মাকে, আসাদের শার্ট, মা, দুঃস্বপ্নে একদিন, স্বাধীনতা তুমি, কাক, একটি কবিতার জন্য, ছেলেবেলা থেকেই, প্রশ্নোত্তর, বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে, টানেলে একাকী, শিরোনাম মনে পড়ে না, সিঁড়ির পর সিঁড়ি, মধ্যরাতের পোস্টম্যান, ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই, আমি এক ভদ্রলোক, একটি ফটোগ্রাফ, মগজে গোধূলি আর হাড়ে রঙিন কুয়াশা, কালো মেয়ের জন্য পঙক্তিমালা, ওরা চলে যাবার পরে, ল্যাম্পপোস্ট, পরিবর্তন, টেবিলে আপেলগুলো হেসে ওঠে, ঝরাপাতা, শ্রোতা, হরিণের হাড় এবং প্রেমের পদাবলী।
গ্রন্থটিতে প্রথমেই অধ্যাপক উসুদা মাসাইউকি অনুবাদক নিওয়া কিয়োকোর একটি চমৎকার পরিচিতি দিয়েছেন। গ্রন্থের শেষদিকে রয়েছে অনুবাদকের দীর্ঘ কিন্তু অসাধারণ একটি ব্যাখ্যা: প্রথমেই বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখনো কত প্রভাবশালী বাঙালি জীবনে। চারজন কবি ও তাঁদের কবিতা সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান, ভাষা আন্দোলন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। এসবের সঙ্গে কবিদের সম্পৃক্ততা, চিন্তাভাবনা, সৃষ্টিশীলতা, জীবনযাপন ইত্যাদি প্রসঙ্গও উপস্থাপিত হয়েছে। এ–ও তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাংলা কবিতায় ‘ইনরিৎসু’ তথা ‘ছন্দ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মুক্তগদ্য এবং নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষার যুগেও ছন্দোবদ্ধ কবিতা বা পদ্য অথবা শব্দের তাল মিলিয়ে কবিতা রচনার প্রবণতা বিদ্যমান। ফলে বাংলা কবিতা যে জাপানি ভাষায় অনুবাদ করা কত কঠিন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, সম্প্রতি প্রয়াত জাপানি রবীন্দ্রগবেষক অধ্যাপক কাজুও আজুমা একবার বলেছিলেন, জাপানি ভাষায় ছন্দ নেই। কবিতার ধ্বনি ও অর্থগত সৌন্দর্যকে পরিস্ফুট করতে গিয়ে সাধারণ জাপানি ভাষার সঙ্গে সংগত নয় শব্দ, বিবরণ ও আঙ্গিক-রীতিকে প্রাধান্য দিতে হয় বলে কিয়োকো লিখেছেন।
সর্বশেষে তিনি জানান, চারজন কবির সঙ্গেই তাঁর একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে জিজ্ঞাসা, কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি কবিদের চিন্তাচেতনা, দর্শন এবং কবিমানসকে বুঝতে প্রয়াস পেয়েছেন; এটা একটা ইতিবাচক দিক।
অধ্যাপক নিওয়া কিয়োকোর আপাত শেষ গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এটা ২০১১ সালে প্রকাশিত কবিগুরুর সার্ধশত জন্মবর্ষে প্রকাশিত তাগো-রু বা টেগোর নামে। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও চিন্তাই এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে একটি অসামান্য তথ্যবহুল গ্রন্থ যা নতুন প্রজন্মের জাপানিদেরকে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অবহিত করবে বলে বিশ্বাস করি। তবে একটা কথা বলতেই হয়, যেহেতু জাপান থেকে গ্রন্থটি লিখিত ও প্রকাশিত, জাপান-রবীন্দ্র সম্পর্কের শতবর্ষ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো এতে সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা যেত বলে মনে হয়। তাহলে গ্রন্থটি সম্পূর্ণ হতো। কারণ রবীন্দ্রজীবনে জাপানের প্রভাব এতই গভীর ছিল যে, পাঁচবার তিনি জাপান ভ্রমণ করেছিলেন।
সংসার ও শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গবেষক নিওয়া কিয়োকো যেভাবে বাংলা সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন, তার জন্য তাঁকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে বলে মনে হয়। নিরন্তর তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের চারজন কবির কবিতা হয়তো অচিরেই জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে আরেকটি মাইলফলক তিনি স্থাপন করবেন। সেই চারজন কবির মধ্যে তিনজনের নাম ইতিমধ্যে তিনি নির্বাচন করেছেন বলে জানা যায়। তাঁরা হলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও জয় গোস্বামী। তাঁর এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে, এটা আমাদের পরম প্রত্যাশা।
প্রবীর বিকাশ সরকার
জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক

Comments are closed.